Education

গ্রামীণ শিক্ষা ও বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র

প্রথমেই বলে নিই, আলোচনার এই বিশেষ বিষয়টিতে আমি কিন্তু আদৌ শিক্ষিত নই। বিষয়টির পরিধি অতি বিস্তৃত – জড়িয়ে আছে শিক্ষাতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, এমনকি হয়তো নৃতত্ত্বও । এত সব তত্ত্বকথায় আমার পড়াশোনা করা শিক্ষালব্ধ জ্ঞান কিছুই নেই । শুধু গ্রামেগঞ্জে লেখাপড়া শেখাবার কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে যা জেনেছি, বুঝেছি, সেটুকুই বলতে পারি আমি। শিক্ষালব্ধ জ্ঞান নেই তাই আমার বক্তব্যে হয়তো কিছু তত্ত্বগত ত্রুটি আপনাদের কারও নজরে পড়তে পারে । তাই কথারম্ভেই মার্জনা চেয়ে রাখি।

গ্রামীণ শিক্ষা ও বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র — বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় আমার মনে হয় প্রথমেই প্রয়োজন, বিষয়বস্তুটি ঠিক কী এবং কী তার পরিধি ও বৈশিষ্ট্য সেটা স্পষ্ট করে নেওয়া। “বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র” নামটা অনেকের কাছেই অপরিচিত। তাই আগে বলে নিতে হয় এটা কী বস্তু। নামটা বেশ গুরুগম্ভীর মনে হলেও ব্যপারটা কিন্তু আদৌ তা নয়। এটি কোনও সংস্থা, সংগঠন, NGO, ইস্কুল, বা প্রতিষ্ঠান নয়, শুধুমাত্র ছোট্ট একটি সহজ সাধারণ ভাবনা ও তার রূপায়নের পরিকল্পনা — an idea and its implementation model ।

ভাবনাটা হল, প্রত্যন্ত, পিছিয়ে পড়া ও আদিবাসী গ্রামগুলিতে গ্রামেরই সহজ স্বাভাবিক পরিবেশে শিশুদের একেবারে বুনিয়াদী স্তর থেকে পড়া লেখা শেখানো। এই প্রচেষ্টা স্কুলশিক্ষার বিকল্প নয়, তাকেই সহজতর ও আকর্ষণীয় করে তোলা এর উদ্দেশ্য । এই ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বছর দশেক আগে, ২০১৪ সালে, বীরভূমের ফুলডাঙা গ্রামে। সেই থেকে অনেকটা পথ চলে, অনেক হোঁচট খেয়ে একটা implementation model হয়ত খাড়া করা গেছে। আপাতত এই প্রচেষ্টার পদচিহ্ন পড়েছে বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদ, ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রায় ৬০টি গ্রামে। এই গ্রামগুলিতে ইস্কুলে পড়া-লেখা করেছেন এমন কোনও মা-মাসি-দিদির মতো গ্রামেরই মহিলা তাঁরই ঘরের আঙিনায় সপ্তাহে পাঁচদিন বিকেলে ঘণ্টা-দুই করে গ্রামের ১৫-২০ জন শিশুকে নিয়ে পড়া-লেখার চর্চায় বসছেন । বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের পাঠগুলি ধরে প্রায় ১০০০ শিশু ধাপে ধাপে শিখছে, হাতেখড়ি থেকে অন্তত ইস্কুলের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, অঙ্ক, আর ইংরেজি।

এই হল বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের কাজ। কী এই মডেল, কীভাবে এটা সংগঠিত করা যায়, কী এর বৈশিষ্ঠ্য, কেন এর প্রয়োজন মনে হল ? গ্রামেগঞ্জে বিস্তৃত সরকারি বিদ্যালয় নামক শিক্ষা পরিকাঠামো এবং আজকাল মফস্বল ও বর্ধিষ্ণু গ্রামে বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয় তো আছে, তাহলে এই বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের কী প্রয়োজন? এই আলোচনায় আমরা পরে আসব। আগে দেখা যাক গ্রামীণ শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি।

শুরুতেই শিক্ষা শব্দটার অর্থটা স্পষ্ট করে নিতে হয় — শিক্ষা বলতে আমরা সাধারণত কী বুঝি? বুঝি ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা। যাঁরা কমবেশি এই কাজটা করেছেন তাঁদের আমরা বলি শিক্ষিত। এই শিক্ষার মাপকাঠিও আছে, কে কতগুলো পাশ করেছে। আর যাঁরা তা একেবারেই করেননি তাঁরা অশিক্ষিত । আরেক ভাবে ভাগ করা হয়, স্বাক্ষর আর নিরক্ষর। মুখের ভাষার ধ্বনিগুলিকে লেখায় প্রকাশ করার বর্ণগুলির সাথে যার পরিচয় আছে, যে সেই বর্ণগুলি পড়তে ও লিখতে পারে, সে হল স্বাক্ষর, আর যে তা পারে না সে হল নিরক্ষর। ইংরেজিতে এই ভাগাভাগিটা হল, লিটারেট (ম্যান অভ লেটারস) আর ইল্‌লিটারেট।

ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যম হল পড়া ও লেখা। সুতরাং, শিক্ষিত হতে গেলে মানুষকে পড়তে ও লিখতে শিখতে হবে। এক কথায় তাই, বর্ণপরিচয় থাকলেই শিক্ষিত আর তা না থাকলে অশিক্ষিত। এই ভাবে ভাগ করাটা যুক্তিযুক্ত কিনা, কী এর তাৎপর্য সে আলোচনা স্বতন্ত্র। এটা যেমন ঠিক নয় যে লেখাপড়াই হল মানুষের শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম, তেমনই এও বলা যায় না যে লেখাপড়া শিখলেই মানুষ শিক্ষিত হয়। এই বিতর্কে না গিয়ে আমরা বরং শিক্ষা বলতে এই আলোচনায় ধরে নিই লেখাপড়া করা। এই সঙ্কীর্ণ অর্থেই শিক্ষা কথাটা এই আলোচনায় ব্যবহার করব। অর্থাৎ, গ্রামীণ শিক্ষা বলতে আমরা বোঝাতে চাইছি গ্রামেগঞ্জে লেখাপড়া শেখানো। এর বেশি কিছু নয়।

এই লেখাপড়ার শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটা কথা স্পষ্ট করে রাখা ভাল —


  • দেশে দেশে ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে লেখাপড়া করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের শিক্ষার ব্যবস্থা করা শুরু হয়েছে খুব বেশি দিন নয় — সভ্যতার ইতিহাসে গত সাত আট’শ বছর মাত্র। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এমন নয় যে এর আগে সাধারণ মানুষের কোনওই শিক্ষা বা তার কোনও ব্যবস্থা ছিল না ।

  • বর্তমানে পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা ৭ হাজারের কিছু বেশি। এর প্রায় অর্ধেক, সাড়ে তিন হাজার ভাষা হল একেবারেই কথ্য ভাষা, যাতে লেখাপড়া আদৌ হয় না। বাকি ভাষাগুলোয় লেখাপড়ার জন্য আছে মাত্র শ’দুয়েক বর্ণমালা বা রিটেন স্ক্রিপ্ট, যেমন ল্যাটিন, আরবী, দেবনাগরী, ইত্যাদি। অর্থাৎ, একাধিক লেখাপড়ার ভাষা প্রায় একই বর্ণমালা ব্যবহার করে।

  • ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার ভাষা হল কোনও একটি ভাষার এক বিশেষ মান্য চলিত রূপ। বাস্তবে দেখা যায় সেই ভাষারই আবার আরও অনেক স্থানীয় কথ্য রূপ আছে, যাদের সাথে ওই মান্য চলিত রূপটির বিস্তর ফারাক ।

  • পৃথিবীতে বহু ভাষা লুপ্ত হয়েছে অন্য আরেকটি ভাষার আধিপত্য বিস্তারের ফলে। । স্বভাবতই, এই আধিপত্য বিস্তার করতে মান্য চলিত লেখাপড়ার ভাষাই হল অধিকতর সক্ষম।

এবার আসা যাক বিদ্যালয়শিক্ষার কিছু সমস্যার কথায় —


  • বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ভাষায় শিক্ষা ও তার আদবকায়দা কিন্তু মানুষকে তার সহজ স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে উচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। এই সমস্যা গ্রামে বেশ প্রকট ও প্রবল । বিশেষ করে সম্প্রতি আদিবাসী শিশুদের বোর্ডিং স্কুল ও ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলি এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে শিঁকড়হীন উচ্ছিন্ন ভাসমান মানুষ।

  • এ কথা আজ প্রতিষ্ঠিত যে first language বা মাতৃভাষার মাধ্যমেই লেখাপড়ার বুনিয়াদি শিক্ষা বাঞ্ছনীয়। বলা হয়, first language first । এমনটা হলে শিক্ষার্থী শিশুর cognitive skill বা জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ ঠিকমতো হয় ও শিশু পরবর্তীকালে একাধিক অন্য ভাষাতেও লেখাপড়া শিখে নিতে সক্ষম হয়। আর এমনটা না হলে, অন্য কোনও ভাষায় লেখাপড়ার বুনিয়াদি শিক্ষা অবরুদ্ধ করে শিশুর মাতৃভাষাকে, আর তাতে ব্যাহত হয় তার জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ, বিচার-বিবেচনা ও যুক্তিবিন্যাসের শক্তি, এমনকি হয়তো মনোজগতের গঠন। সমস্যা হল, first language literacy বা first language first কি স্কুলশিক্ষার ব্যবস্থায় আদৌ সম্ভব, বা কতটা সম্ভব? পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চলে, বিশেষত কলকাতার ইস্কুলে হয়তবা বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দী ভাষাভাষিদের ঘরের শিশুরা এই সুযোগ পেলেও পেতে পারে। কিন্তু বাকিদের শিক্ষার কী হবে? পশ্চিমবঙ্গে সরকার স্বীকৃত ভাষাই আছে সম্ভবত ১৩টি। এছাড়া আছে বহু স্থানীয় কথ্য ভাষা, এমনকি আছে মান্য চলিত কলকাতার বাংলার নানাবিধ কথ্য রূপ, যাকে হয়ত বাংলা বলে চেনাই যায় না।

  • প্রশ্ন হল, মান্য চলিত লেখাপড়ার ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থাটা কেমন হবে, কীভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত হবে, যাকে বলে, কী হবে এর ডেলিভারি মেকানিজম (delivery mechanism)? উত্তর হল, দেশের প্রতি রাজ্যে সরকার স্বীকৃত একটি, দুটি, বা তিনটি (আমাদের দ্বিভাষা, ত্রিভাষা বিতর্ক) মান্য চলিত লেখাপড়ার ভাষায় সারা রাজ্যে অভিন্ন একটি ব্যবস্থা স্থাপন করা — যেখানে থাকবে নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম ও পঠনপাঠনের নির্দিষ্ট পুস্তিকা, ক্লাসরুম, টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চি, ইত্যাদি নিয়ে বিদ্যালয় ভবন, আর ওই ভাষায় পঠনপাঠনে প্রশিক্ষিত কিছু শিক্ষিকশিক্ষিকা । এই বিদ্যালয়শিক্ষার ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য আমরা পরে উল্লেখ করছি।

  • প্রতি রাজ্যেই আছে বৈচিত্র্য — প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে দেখা যায় বিস্তর ফারাক । এই বৈচিত্রের মাঝে একটি অভিন্ন বিদ্যালয়শিক্ষা ব্যবস্থার অভিন্ন পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে নানা বিষয়ের অভিন্ন উপস্থাপনায় স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পায় শহুরে পরিপ্রেক্ষিত, কারণ সেই তো হল এই শিক্ষার পীঠস্থান । ফলে বুনিয়াদি শিক্ষার স্তরেই দেখা যায় গ্রামেগঞ্জের শিক্ষার্থীদের ওপর এসে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক, তাদের কাছে অর্থহীন, তথ্যের বোঝা। শিশুকাল থেকেই তথ্য ভারাক্রান্ত লেখাপড়া হয়ে ওঠে এক দুরতিক্রম্য বিষয়।

  • এই বিদ্যালয়শিক্ষার ব্যবস্থা কি স্বাবলম্বী হতে পারবে? বিদ্যালয়শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার খরচ যে আজকের হিসাবে শিশু প্রতি ন্যূনতম ৫০০–৭০০ টাকা। গ্রামেগঞ্জে খুব কম শিশুশিক্ষার্থীর অভিভাবকরা পারবেন শিশুপ্রতি এই টাকা ইস্কুলের মাইনে হিসাবে দিতে। এই শিক্ষার ব্যবস্থাকে তাহলে হতেই হয় নেহাতই এক সরকারি দানছত্র অথবা বেসরকারি ব্যবসায়িক উদ্যোগ মাত্র ।

  • এই ধরনের বিদ্যালয়শিক্ষার ব্যবস্থা স্থানীয় সমাজের সাথে তেমন কোনও সংযোগ স্থাপন করতে পারে না। স্থানীয় শিশুর কাছে বিদ্যালয়ের লেখাপড়া এক ভীতিজনক বাইরে থাকা আসা বিষয় হয়েই থেকে যায়।

আমাদের আলোচনার শিরনামে আছে “গ্রামীণ শিক্ষা”। গ্রামীণ শিক্ষা বা rural education বললে মনে হয় যে এটা শহুরে শিক্ষা বা urban education থেকে আলাদা অন্য কিছু? বাস্তবে কিন্তু তা দেখি না। আমরা গ্রামের শিক্ষাকর্মে শহরের থেকে আলাদা কিছু দেখি না। সেই শহুরে শিক্ষার আদলে একই শিক্ষাব্যবস্থা, সেই একই বিদ্যালয়, ক্লাসরুম, টেবিল চেয়ার বেঞ্চ ব্ল্যাকবোর্ড, সেই প্রশিক্ষিত মাস্টার স্যার বা আন্টি, সেই একই পাঠ্য বই, একই সিলেবাস, একই পরীক্ষা ব্যবস্থা। অথচ, এই পার্থক্যটা জরুরী ছিল। আজকের এই আলোচনার শিরোনামে গ্রামীণ শিক্ষা কথাটা হয়ত এই পার্থক্যটাকেই স্পষ্ট করতে চেয়েছে। এই পার্থক্যটাকে ধরতে পারাই আজকের আলোচনার ভিত্তি। এর প্রয়োজনটা বুঝতে না পারলে আমরা একই কানাগলিতে ঘুরে মরব।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৮ সালে (বঙ্গাব্দ ১২৮৫) ‘লোকশিক্ষা’ প্রসঙ্গে লিখেছেন—

“. . . বাঙ্গালার ছয় কোটি ষাটি লক্ষ লোকের দ্বারা যে কোন কার্য্য হয় না, তাহার কারণ এই যে, বাঙ্গালার লোকশিক্ষা নাই। যাঁহারা বাঙ্গালার নানাবিধ উন্নতি সাধনে প্রবৃত্ত, তাঁহারা লোকশিক্ষার কথা মনে করেন না। আপন আপন বিদ্যাবুদ্ধি প্রকাশেই প্রমত্ত। ব্যাপার বড় অল্প আশ্চর্য্য নহে।

“ইহা কখনো সম্ভব নহে যে, বিদ্যালয়ে পুস্তক পড়াইয়া, ব্যাকরণ, জ্যামিতি শিখাইয়া সপ্তকোটি লোকের শিক্ষা বিধান করা যাইতে পারে। সে শিক্ষা শিক্ষাই নহে, এবং সে উপায়ে এ শিক্ষা সম্ভবও নহে। . . . আমাদের একটুকু বিশ্বাস আছে যে, ব্যাকরণ জ্যামিতিতে সে শিক্ষা হয় না এবং রামমোহন রায় হইতে ফটিকচাঁদ স্কোয়ার পর্য্যন্ত দেখিলাম না যে, ইংরেজী-নবীশ সে বিষয়ে কোনো কথা কহিয়াছেন।

“এখনকার অবস্থা এইরূপ হইয়াছে বটে, কিন্তু চিরকাল যে এদেশে লোকশিক্ষার উপায়ের অভাব ছিল, এমত নহে। লোকশিক্ষার উপায় না থাকিলে শাক্যসিংহ কি প্রকারে সমগ্র ভারতবর্ষকে বৌদ্ধধর্ম্ম শিখাইলেন? মনে করিয়া দেখ, বৌদ্ধধর্ম্মের কূট তর্কসকল বুঝিতে আমাদের আধুনিক দার্শনিকদিগের মস্তকের ঘর্ম চরণকে আর্দ্র করে; মক্ষমূলার যে তাহা বুঝিতে পারেন নাই, কলিকাতা রিবিউতে তাহার প্রমাণ আছে। সেই কূটতত্ত্বময়, নির্ব্বাণবাদী, অহিংসাত্মা, দুর্বোধ্য ধর্ম্ম শাক্যসিংহ এবং তাঁহার শিষ্যগণ সমগ্র ভারতবর্ষকে — গৃহস্থ, পরিব্রাজক, পণ্ডিত, মূর্খ, বিষয়ী, উদাসীন, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, সকলকে শিখাইয়াছিলেন। লোকশিক্ষার কি উপায় ছিল না? শঙ্করাচার্য্য সেই দৃঢ়বদ্ধমূল দিগ্বিজয়ী সাম্যময় বৌদ্ধধর্ম্ম বিলুপ্ত করিয়া আবার সমগ্র ভারতবর্ষকে শৈবধর্ম্ম শিখাইলেন— লোকশিক্ষার কি উপায় ছিল না? সেদিনও চৈতন্যদেব সমগ্র উৎকল বৈষ্ণব করিয়া আসিয়াছেন। লোকশিক্ষার উপায় কি ছিল না? আবার এদিকে দেখি, রামমোহন রায় হইতে কালেজের ছেলের দল সাড়ে তিনপুরুষ ব্রাহ্মধর্ম্ম ঘুষিতেছেন। কিন্তু লোকে ত শেখে না। লোকশিক্ষার উপায় ছিল, এখন আর নাই।

“একটা লোকশিক্ষার উপায়ের কথা বলি—সেদিনও ছিল—আজ আর নাই। কথকতার কথা বলিতেছি। . . . সে কথক কোথায় গেল? কেন গেল? বঙ্গীয় নব্য যুবকের কুরুচির দোষে। গুল্‌কি কাওরাণী শুয়ার চড়াইতে অপারগ হইয়া কুপথ অবলম্বন করিয়াছে। তাহার গান বড় মিষ্ট লাগে, কথকের কথা শুনিয়া কি হইবে? . . . চল ভাই, ব্রান্ডি টানিয়া থিয়েটারে গিয়া কাওরাণীর টপ্পা শুনিয়া আসি। এই অল্প ইংরেজীতে শিক্ষিত, স্বধর্ম্মভ্রষ্ট, কদাচার, বঙ্গীয় যুবকের গুণে লোকশিক্ষার উপায় ক্রমে লুপ্ত ব্যতীত বর্দ্ধিত হইতেছে নাশিক্ষিত, অশিক্ষিতের হৃদয় বুঝে না। শিক্ষিত, অশিক্ষিতের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না। মরুক্‌ রামা লাঙ্গল চষে, আমার ফাউল কারি সুসিদ্ধ হইলেই হইল। রামা কিসে দিনযাপন করে, কি ভাবে, তার কি অসুখ, তার কি সুখ, তাহা নদের ফটিকচাঁদ তিলার্দ্ধ মনে স্থান দেয় না। বিলাতে কানা ফসেট্‌ সাহেব, এদেশে সার অস্‌লি ইডেন, ইঁহারা তাঁহার বক্তৃতা পড়িয়া কি বলিবেন, নদের ফটিকচাঁদের সেই ভাবনা। . . . ছয় কোটি ষাটি লক্ষের ক্রন্দনধ্বনিতে আকাশ যে ফাটিয়া যাইতেছে—বাঙ্গালার লোক যে শিখিল না। বাঙ্গালার লোক যে শিক্ষিত নাই, ইহা সুশিক্ষিত বুঝেন না।”

এরপর দেখি ‘শিক্ষাসমস্যা’ প্রবন্ধে ১৯০৬ সালে (বঙ্গাব্দ ১৩১৩) রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন —

“ . . . এই জিজ্ঞাসা মনে উঠে যে, কোন্‌ ভাবে এই শিক্ষাকার্য চলিবে। কোন্‌ নিয়মে চলিবে এবং কী কী বই পড়ানো হইবে, সে-সমস্ত বাহিরের কথা। ইহার উত্তরে যদি কেহ বলেন, ‘জাতীয়’ ভাবে শিক্ষা দেওয়া হইবে তবে প্রশ্ন উঠিবে, শিক্ষা সম্বন্ধে ‘জাতীয়’ ভাব বলিতে কী বুঝায়? ‘জাতীয়’ শব্দটির কোনো সীমানির্দেশ হয় নাই, হওয়াও শক্ত। . . . যদি ভুল করি — যেটা হাতের কাছেই আছে, আমরা যেটাতে অভ্যস্ত, জড়ত্ববশত যদি সেইটেকেই সত্য মনে করি, তবে বড় বড় নাম আমাদের বিফলতা থেকে রক্ষা করিতে পারিবে না। . . .

“য়ুরোপে মানুষ সমাজের ভিতরে থাকিয়া মানুষ হইতেছে, ইস্কুল তাহার কথঞ্চিৎ সাহায্য করিতেছে। লোকে যে বিদ্যা লাভ করে সে বিদ্যাটা সেখানকার মানুষ হইতে বিচ্ছিন্ন নহে। . . . এই জন্য সেখানকার বিদ্যালয় সমাজের সঙ্গে মিশিয়া আছে, তাহা সমাজের মাটি হইতেই রস টানিতেছে এবং সমাজকেই ফলদান করিতেছে। কিন্তু বিদ্যালয় যেখানে চারিদিকের সমাজের সঙ্গে এমন এক হইয়া মিশিতে পারে নাই— যাহা বাহির হইতে সমাজের উপর চাপাইয়া দেওয়া তাহা শুষ্ক, তাহা নির্জীব, তাহার কাছ হইতে যাহা পাই কষ্টে পাই, এবং সে বিদ্যা প্রয়োগ করিবার বেলা সুবিধা করিয়া উঠিতে পারি না।

“. . . এই জন্যই বলিতেছি, য়ুরোপের বিদ্যালয়ের অবিকল বাহ্য নকল করিলেই আমরা যে সেই একই জিনিস পাইব এমন নহে। এই নকলে সেই বেঞ্চি, সেই টেবিল, সেই প্রকার কার্যপ্রণালী সমস্তই ঠিক মিলাইয়া পাওয়া যায়, কিন্তু তাহা আমাদের কাছে বোঝা হইয়া ওঠে। . . . অতএব বিলাতের নজির একেবারে ছাড়িতে হইবে; কারণ, বিলাতের ইতিহাস, বিলাতের সমাজ আমাদের নহে। আমাদের দেশের লোকের মনকে কোন্‌ আদর্শ বহু দিন মুগ্ধ করিয়াছে, আমাদের দেশের লোকের হৃদয়ে রসসঞ্চার হয় কিসে, তাহা ভালো করিয়া বুঝিতে হইবে। বুঝিবার বাধা যথেষ্ট আছে। আমরা ইংরেজি স্কুলে পড়িয়াছি, যে দিকে তাকাই ইংরেজের দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে প্রত্যক্ষ। ইহার আড়ালে আমাদের দেশের ইতিহাস, আমাদের স্বজাতির হৃদয় অস্পষ্ট হইয়া আছে।

“. . . বিলাতের কোন্‌ কলেজে কোন্‌ বই পড়ানো হয় এবং তাহার নিয়ম কী, ইহা লইয়া তর্কবিতর্কে কালক্ষেপ করা সময়ের সম্পূর্ণ সদ্‌ব্যবহার নহে। এ সম্বন্ধে আমাদের হাড়ের মধ্যে একটা অন্ধ সংস্কার প্রবেশ করিয়াছে। যেমন তিব্বতী মনে করে যে লোক ভাড়া করিয়া তাহাকে দিয়া একটা মন্ত্রলেখা চাকা চালাইলেই পুণ্যলাভ হয়, তেমনি আমরা মনে করি কোনোমতে একটা সভা স্থাপন করিয়া কমিটির দ্বারা যদি সেটা চালাইয়া যাই তবেই আমরা ফললাভ করিব। বস্তুত সেই স্থাপন করাটাই যেন লাভ।

শহুরে শিক্ষা থেকে গ্রামীণ শিক্ষার পদ্ধতিকে অন্তত বুনিয়াদি থেকে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত অনেকটাই আলাদা হতে হবে। তা নাহলে প্রত্যন্ত পিছিয়ে পড়া ও আদিবাসী গ্রামগুলিতে আমাদের লেখাপড়া শেখানোর প্রয়াস আদৌ সফল হবে না। এর কারণ, গ্রাম ও শহরের কিছু পার্থক্য ও শহুরে শিক্ষার কিছু বিশেষ দিক।

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়, গ্রামে কিন্তু আমরা শিক্ষার্থী পাব অধিকাংশই প্রথম প্রজন্মের। আক্ষরিক অর্থে তা নাহলেও, বাস্তব হল, বাড়িতে কেউ শিশুকে লেখাপড়াটা হাতে ধরে একটু দেখিয়ে দেবে এমনটা হয় না, শহরের মতো শিশুর জন্য গৃহশিক্ষক রাখা থাকবে এও সম্ভব হয় না, বিশেষ করে প্রাক্-প্রাথমিকের বুনিয়াদি স্তরে। এমনকি, দেখেছি বাড়িতে এমন কোনও জায়গাই নেই যেখানে শিশু লেখাপড়ার বইপত্র, সাজ-সরঞ্জাম রাখবে, নিয়মিত পড়তে বসবে। ইস্কুলের ব্যাগেই রাখতে হয় যাবতীয় বইখাতা ইত্যাদি। তারই বোঝা সে পিঠে করে রোজ বয়ে নিয়ে যায় ও আসে লেখাপড়া করতে।

এর পাশাপাশি উল্লেখ করতে হয় শিশুর পারিপার্শ্বিক জগতের কথা। শহরের শিশু দেখতে অভ্যস্ত মানুষের বসবাসের বড় বড় এমনকি আকাশ্চুম্বী বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, খেলার পার্ক, দোকানবাজার, শপিং মল। সে তার রোজকার জীবনেই দেখতে পায় জীবনধারণের নানাবিধ টেবিল চেয়ার ইত্যাদি আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির সাজসরঞ্জাম, আর ব্যবহারের কিছু বইপত্র, পত্রপত্রিকা, এমনকি লেখার পেন-পেনসিল, টিভি, স্মার্টফোন, ইত্যাদি। শুনে শুনে সে শিখে যায় এগুলির নাম। আর সর্বত্রই তার চোখে পড়ে লিখিত বর্ণ। প্রত্যন্ত গ্রামে মাটির বাড়িতে বড় হওয়া শিশুর পারিপার্শ্বিক জগৎ এমনটা নয়। আমার দেখা গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে আমি কোনও বই দেখিনি, সে পাঁজিই হোক বা লক্ষ্মীর পাঁচালি কী ছোটদের রামায়ণ মহাভারত। দেখিনি বাড়ির বড়দের ব্যবহারের কোনও কাগজ-পেন। বাড়িতে কোনও রকম কোনও লেখা ও পড়ার চলই নেই। এমনই যাদের পারিপার্শ্বিক জগৎ, গ্রামের সেই প্রথম প্রজন্মের শিশুশিক্ষার্থীদের আমরা লেখাপড়া শেখাতে চাই। সে কি শহরের বিদ্যালয় শিক্ষার আদলে আদৌ সম্ভব?

শহরের বিদ্যালয়শিক্ষার মূল কয়েকটা দিক একটু দেখে নেওয়া যাক —

এখানে লেখাপড়ার কাজটা চলে অনেকটাই কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার ব্যাচ প্রসেসিংয়ের মতো করে। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি — এক এক বছরে এক একটা শ্রেণির লেখাপড়া সম্পূর্ণ করা হল বিদ্যালয়শিক্ষা। আজকাল অবশ্য প্রাক-প্রাথমিকের দুটি বছরকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছে শহরের অনেক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল।


  • লেখাপড়ার মাধ্যম হিসাবে বিদ্যালয়ে যে ভাষাটি নির্দিষ্ট (অর্থাৎ মান্য চলিত বাংলা, বা ইংরেজি, বা হিন্দি), কেবলমাত্র সেই ভাষাতেই শিশুকে লেখাপড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
  • নির্দেশভিত্তিক শিক্ষা — শিক্ষার্থীদের শ্রেণিতে ভাগ করে শ্রেণিবদ্ধ সকলকে শ্রেণির পাঠগুলি একই সাথে একই ভাবে পড়িয়ে দেওয়া হয় ও হোমওয়ার্ক দিয়ে দেওয়া হয়। কোনও শিশু এই পড়ার সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে না পারলে আছে parent-teacher meeting — অভিভাবককে ডেকে বলে দেওয়া হয় শিশুর লেখাপড়ার দিকে নজর দিতে, সে ঠিকমতো হোমওয়ার্ক করে আনছে না।

    • নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম ও তার জন্য নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তকের পাঠগুলি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হয়।

কথারম্ভে আমরা বলেছিলাম বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র হল ছোট্ট একটি সহজ সাধারণ ভাবনা ও তার রূপায়নের পরিকল্পনা — প্রত্যন্ত, পিছিয়ে পড়া ও আদিবাসী গ্রামগুলিতে গ্রামেরই সহজ স্বাভাবিক পরিবেশে শিশুদের একেবারে বুনিয়াদী স্তর থেকে পড়া লেখা শেখানো। মনে হতেই পারে এ আর এমন কী। কিন্তু, বছর দশেকের পথ চলা থেকে অভিজ্ঞতা হল, কাজটা আদৌ সহজ নয়। এর থেকে অনেক সহজ হল বিদ্যালয় স্থাপন করে ফেলা — যে কাজে আজকাল দেখি অনেক এনজিও বা সমাজসেবীরা এগিয়ে এসেছেন, কিছু কিছু আদিবাসী গ্রামে দেখি তাঁরা স্কুলবাড়ি নির্মাণ করে বিদ্যালয়, এমনকি বোর্ডিংস্কুলও স্থাপন করছেন।

তাই ওপরে দেওয়া রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতিটাকেই পুনরায় উল্লেখ করি — আমরা মনে করি কোনোমতে একটা সভা (বিদ্যালয়) স্থাপন করিয়া কমিটির দ্বারা যদি সেটা চালাইয়া যাই তবেই আমরা ফললাভ করিব। বস্তুত সেই স্থাপন করাটাই যেন লাভ। সরকারবাহাদুরও একই পথে বিদ্যালয়শিক্ষার প্রসারের পরিসংখ্যান হাজির করেন, গ্রামেগঞ্জে বিদ্যালয়ের সংখ্যা, ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা, এনরোলমেন্ট রেশিও, ড্রপ আউট রেট, ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন তবুও থেকে যায় — সত্যিই কি শিক্ষার প্রসার ঘটছে, প্রত্যন্ত গ্রামগুলির প্রান্তিক শিশুরা কি যথাযথ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে? নাকি এই বিদ্যালয় শিক্ষার প্রসার করতে গিয়ে আমরা কিছু শিঁকড়হীন, উচ্ছিন্ন ভাসমান মানুষও তৈরি করে ফেলছি যার আসলে কোনও শিক্ষাই নেই?

এতসব উপলব্ধির পরেও প্রত্যন্ত গ্রামে বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের কাজ করে চলেছি কেন, কোন পথে ? গ্রামে শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর কী এমন প্রক্রিয়া খুঁজে নিয়েছি যাতে এতসব সমস্যার সমাধানের কোনও পথ পাওয়া যায়?   


  1. বিদ্যাচর্চার এই ব্যবস্থা ইস্কুল শিক্ষার বিকল্প নয়, সহায়ক। এর দরকার হল, কারণ আজকাল ইস্কুলের পড়া শুধু মুখস্তই  হয়, লেখাপড়াটা তেমন আর শেখা হয় না। শিশুশিক্ষার সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলো তো তাই বলে। দেখা গেছে, ইস্কুল ব্যবস্থায় শিশুশিক্ষার মহাযজ্ঞ চলেছে, তবুও সাধারণ যোগ-বিয়োগই করতে শেখেনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বহু শিশু (annual status of education report 2019)।
  2. ‘বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র’ (vidyacharcha kendra) নামটা বেশ গুরুগম্ভীর শোনালেও ব্যাপারটার শুরু কিন্তু খুবই সহজ সাধারণ। এক একটা গ্রামে ১৫-২০ জন করে শিশুকে নিয়ে একসাথে বসে (মণ্ডলী প্রথা) গ্রামেরই এক একজন দিদিমণি লেখাপড়া শেখার চর্চা করছেন তাঁরই বাড়ির আঙিনায়, দিনে মোটামুটি দুই ঘণ্টা করে। এখানে নেই শিশুশিক্ষার নামে কোনও মহৎ যজ্ঞের আয়োজন — না আছে ইট কাঠ পাথরের ইস্কুল বাড়ি নামক প্রতিষ্ঠান ও তার চেয়ার টেবিল বেঞ্চি ব্ল্যাকবোর্ড, না আছে ‘মাস্টার’ আর শিশুদের শ্রেণি বা ক্লাসে ক্লাসে ভাগ করে বছর ধরে ও প্রতিদিন ঘণ্টা ধরে এক একটা পাঠ পড়ার একই নির্দেশ সকলকে দিয়ে দেওয়া, না আছে শিশুর পিঠে ব্যাগ ভর্তি বিশালাকার রঙবেরঙের বই আর খাতার বোঝা, না আছে ইস্কুলের জামা জুতোর ইউনিফর্ম আর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার নানান বিধিনিষেধ। 

  3. বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রে আছে মূল লক্ষ্যটাকেই সামনে রাখা, যাতে এতসব উপলক্ষ্যের ভিড়ে আসল লক্ষ্যটাই যেন না-যায় হারিয়ে। তাই বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের পাঠ সংকলনগুলিতে যাবতীয় মেদবাহুল্য বাদ দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে — নির্দেশ নয়, নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে —শিশুরা ধাপে ধাপে ঠিক কী কী শিখবে, কতটা শিখবে, ও কীভাবে শিখবে। এই উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছে একেবারে প্রাক্‌-প্রাথমিকের হাতেখড়ি থেকে শুরু করে ইস্কুলের প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত বাংলা, অঙ্ক ও ইংরেজির পাঠ সংকলনের ছোট ছোট পুস্তিকা, যা শিশুহাতে নাড়াচাড়ার উপযোগী ও তাই তার কাছে ভীতিপ্রদও নয়। শেখার জন্য প্রত্যেক শিশুর হাতেই এই পুস্তিকা দেওয়া হয়। 

  4. এখানে উল্লেখ করতেই হয় যে পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণির পাঠ্য, ‘আমার বই’ হল বড়সড় আকারের ৫২৪ পৃষ্ঠার একটি পুস্তক (এ ছাড়াও আছে স্বাস্থ্য ও শারীরশিক্ষা, ৬০ পৃষ্ঠা, ও সহজ পাঠ, ৭৯ পৃষ্ঠা)। এসবই নাকি ৬ বছরের শিশু এক বছর বরাদ্দ সময়ে (বড়জোর ১৮০ দিনে) পড়ে শিখে ফেলবে! আর এই পঠনপাঠনটি করিয়ে দেবেন সরকার নিযুক্ত উপযুক্ত শিক্ষণপ্রাপ্ত (ডি ইএল এড) কিন্তু গ্রামের ‘বহিরাগত’ শিক্ষক-শিক্ষিকারা। 

স্বভাবতই এই পঠনপাঠন চলে ঘণ্টা ধরে, টেবিল চেয়ারে বসা শিক্ষক-শিক্ষিকার বই থেকে পড়ে বা বোর্ডে লিখে দেওয়া নির্দেশকে ভিত্তি করে। এক একটি শ্রেণিকক্ষে একদল শিশুকে সার বেঁধে বসিয়ে সকলকে একই নির্দেশমূলক শিক্ষাদানের প্রথাগত ইস্কুল ব্যাপারটা যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে লেখাপড়া করিয়ে দেওয়ার কারখানা। এখানে কারখানার পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার মতোই চলে শিশুদের ওপর লেখাপড়া ঘষামাজা করার প্রক্রিয়া (batch processing in school education) — এক এক বছরে (এর নাম অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার) এক একটা শ্রেণির ঘষামাজা প্রক্রিয়ার শেষে শিশুর প্রবেশ ঘটে পরবর্তী শ্রেণিতে। 

স্কুল শিক্ষায় আছে এমন ১২টা শ্রেণি (৬ থেকে ১৭ বছর বয়েস)। কারখানার পণ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো এখানেও কিছু পণ্য বাতিল হয় ঠিকঠাক না হওয়ার কারণে। এখানে এর নাম ড্রপ আউট, যদিও মিড-ডে মিল দেওয়া আর পাশ-ফেল প্রথা না-থাকার ফলে উচ্চ-প্রাথমিক স্তর (অষ্টম শ্রেণি) পর্যন্ত স্কুল ড্রপ আউট কমানো গেছে অনেকটা। কিন্তু তারপরেই প্রতি পাঁচজনের একজনকে ড্রপ আউট হতে দেখা যায়। শিশুশিক্ষার এই কারখানায় শিশুর বোঝা বা শেখা নয়, শিক্ষাদান মানে পাঠ্যপুস্তকের পাঠগুলো ধরে পড়িয়ে দেওয়া। কোন্‌ শিশু কতটা শিখল বা শিখল না, কে একটু এগিয়ে বা কে একটু পিছিয়ে, সেসব দেখার অবকাশ এখানে নেই।    


  1. বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের শিক্ষণ পদ্ধতিটা অন্য (learner centered approach)। এখানে শিক্ষক-শিক্ষিকা তথা ‘মাস্টারের’ নির্দেশ নয়, দিদিমণি ও শিশুরা একসাথে গোল হয়ে বসে চর্চার মাধ্যমে পাঠগুলো বোঝে, শেখে ও বারংবার অনুশীলন করে। শিশুদের কাছে আপনজন হিসাবে পরিচিত গ্রামেরই কোনও অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানা মহিলা, মা-মাসি বা দিদির মতো যত্ন করে, পাশে বসে লেখাপড়া শেখান। এই দিদিমণিদের নিজেদেরও অনেকটাই শিখে নিতে হয় — পর পর ধাপে ধাপে শিশুদের কী শেখাব, কীভাবে শেখাব। শিশুর লেখাপড়ার সাথে সাথে এটা দিদিমণিদেরও চর্চা । 

  2. তাই বিদ্যাচর্চার মূল কথাটাই হল — আমরাই শিখি, আমরাই শেখাই। বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের পাঠ সংকলনগুলি তৈরি করা হয়েছে এই লক্ষ্যকেই সামনে রেখে যাতে গ্রামের মা-মাসিরা পারেন তাঁদের শিশুদের প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত লেখাপড়াটা শিখিয়ে দিতে। এর একটাই লক্ষ্য শেখা, ইস্কুলের বই ধরে পড়া তৈরি করিয়ে দেওয়ার ‘প্রাইভেট কোচিং’ নয়।  

  3. বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রে ইস্কুলের মতো বছর ধরে ক্লাসে ভাগ করার ব্যাপারটা নেই। কোন্‌ শিশু কতটা শিখেছে ও পারছে মূলত তাকেই ভিত্তি করে, সাধারণত ৩ থেকে ৭ বছরের শিশুদের (ইস্কুলের প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে প্রথম শ্রেণি) একত্রে নিয়ে একজন ও ৭ থেকে ১১ বছরের শিশুদের (ইস্কুলের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি) একত্রে নিয়ে বিদ্যাচর্চায় বসেন আরেকজন দিদিমণি। 

  4. এখানে সব শিশুকে বই খুলে একই পাঠ পড়তে নির্দেশ দেওয়া হয় নয়। যারা যে পাঠটা পড়ে রপ্ত করে ফেলেছে তাদেরকে পরের পাঠ বুঝিয়ে দিয়ে অনুশীলনে রপ্ত করতে দেওয়া হয়। আর যাদের যে পাঠটা রপ্ত করতে আরও একটু সময় লাগবে তাদের সে সময়টা দিয়ে আরও একটু অভ্যেস করানো হয়। অর্থাৎ, যে এগোতে পারে তাকে এগোতে দেওয়া হয়, আর যার এখনও রপ্ত হয়নি তাকে সাহায্য করা হয় আরও সময় দিয়ে রপ্ত করতে। এই কাজটা গোল হয়ে ১৫-২০ জন শিশুর মাঝে বসা দিদিমণির করা সম্ভব, যা ইস্কুল নামের কারখানায় করা যায় না। 

  5. এখানে ইস্কুলের মতো এক বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পাঠগুলো যে করে হোক পড়িয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। ৩ থেকে ৭ বছর শিশুদের যার যখন সবগুলো পাঠ মোটামুটি শেখা হয়ে যায়, তাকে উন্নীত করা হয় পরবর্তী প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠে। এরও কোনও নির্ধারিত সময় বা সংখ্যা নেই। সময়ে সময়ে দু-চারজন করে শিশু যেমন প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরে উন্নীত হয়, তেমনই আরও নতুন শিশু এসে যোগ দেয় প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরে। এক নিরবচ্ছিন্ন স্রোতে গ্রামের শিশুদের বিদ্যাচর্চা চলে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরে। শিশুরা শেখার বিশেষ বিশেষ দিকগুলো ঠিক ভাবে রপ্ত করেছে কিনা ও ধাপে ধাপে কতটা শিখেছে, তা যাচাই করার একটি রূপরেখাও তৈরি করা গেছে।                

বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের শিক্ষণ পদ্ধতির  রূপরেখা  তৈরি হয়েছে গত ৬-৭ বছরে প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসী শিশুর লেখাপড়ায় সহায়তা করার পথে চলতে গিয়ে বারংবার হোঁচট খেয়ে। প্রথাগত ইস্কুলের শহুরে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষণ পদ্ধতি দিয়েই প্রথমে চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু বোঝা গেল, ও পথে শিশুশিক্ষার মহাযজ্ঞ চলতে পারে। সেখানে শিশুরা হয়ত পড়ে অনেক, কিন্তু তার শেখায় পড়ে ফাঁকি।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সুতনু ভট্টাচার্য

ইনস্টিটিউট অভ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস, কলকাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *